প্রকাশ বিশ্বাস বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক ঢাকা, জুন ০৫ (বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম)- ২০০৯ সাল থেকে তুরাগ নদীর দূষণের কারনে টঙ্গীর এভারওয়ে ইয়ার্ন ডাইয়িং লিঃ কে ৩১ লাখ টাকা জরিমানা করে পরিবেশ অধিদপ্তর পরিচালিত ভ্রাম্যমাণ আদালত। গত শনিবার ছাড়পত্র বিহীন এ কারখানাটিকে তুরাগে বর্জ্য ফেলার দায়ে এ জরিমানা করা হয়। পরিবেশ অধিদপ্তর পরিচালিত অভিযানে প্রতি সপ্তাহেই এ রকম দোষী প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা করা হলেও কিছুদিন পরই তারা আবার একই অপরাধ করছে। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের অনুসন্ধানে দেখা যায়, পরিবেশ অধিদপ্তরের ভ্রাম্যমাণ আদালতের কারণে ঢাকাসহ দেশের পরিবেশ আদালতগুলোতে পর্যাপ্ত মামলা নেই । অথচ পরিবেশ অধিদপ্তরের মহা-পরিচালকের ভাষ্য অনুযায়ী, দেশের সবগুলো জেলাতেই কয়েকদিন আগে পরিবেশ আদালত স্থাপন করা হযেছে। এ সব আদালতের সংশ্লিষ্ট আইনজীবী ও পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোর সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, অধিদপ্তর ও আদালতের কাজের সমন্বয়ের অভাবে এসব আদালতে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ আসতে চায় না। মামলা ও তদন্তে দীর্ঘ সময় লাগার পাশাপাশি বিচারে দীর্ঘসূত্রতাও এর জন্য দায়ী। ঢাকার পরিবেশ আদালতের রাষ্ট্রপক্ষের কৌশুলি ফিরোজুর রহমান মন্টু ভ্রাম্যমাণ আদালতের কারণে বিচারিক আদালতে মামলা নেই উল্লেখ করে তাদের কাজের বিরোধিতা করে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে পরিবেশ বিষয়ক আইনে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনাসহ ব্যাপক ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু কোনো শিল্প প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা করতে হলে তাকে আইন অনুযায়ী নোটিশ পাঠানো এবং জরিমানা করা উচিৎ। “অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা যেভাবে জরিমানা করছেন তাতে সঠিকভাবে আইন মানা হচ্ছে না। শিল্প প্রতিষ্ঠানের মালিকদের এভাবে গণহারে চোর সাব্যস্ত করা উচিৎ নয়। তাতে মানবাধিকারের লঙ্ঘন হয়। জনস্বার্থে কাজ করতে গিয়ে তাদের অধিকারের উপর হস্তক্ষেপ করার কারো কোনো অধিকার নেই।” তিনি জানান, বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়ে অধিদপ্তরের কতিপয় কর্মকর্তা কম জরিমানা করেন দোষী শিল্প প্রতিষ্ঠানকে। ফলে সরকারের রাজস্বেরও ক্ষতি হয়। পরিবেশ আদালতে কম মামলা দায়েরের কারণ সম্পর্কে বাংলাদেশ এনভায়রনমেন্ট ল’ইয়ার্স এসোসিয়েশনের (বেলা) আইনজীবী ইকবাল হোসেন লিটন সোমবার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “পরিবেশ বিষয়ক মামলা নিয়ে প্রশাসন ও বিচারবিভাগের মধ্যে অবশ্যই দূরত্ব রয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত সাধারণ মানুষ আইন-আদালতের দ্বারস্থ হতে ভয় পায়। এর অন্যতম কারণ বিচারের দীর্ঘসূত্রতা। যে কারণে ভ্রাম্যমাণ আদালতের তাৎক্ষণিক শাস্তির বিষয়টিকে মানুষ ভালো ভাবেই নিচ্ছে। কিন্তু ভ্রাম্যমাণ হাকিমদের কার্যক্রমের কারণে বিচার বিভাগের ক্ষমতাও ক্ষুন্ন হচ্ছে।” এ সব বক্তব্যের বিরোধিতা করে পরিবেশ অধিদপ্তরকে অত্যন্ত সফল দাবি করে এর মহাপরিচালক মনোয়ার ইসলাম বলেন, “মানুষ কেন আদালতে যেতে ভয় পান তা বলতে পারবো না। তবে পরিবেশ অধিদপ্তর পরিবেশ বিপর্যয় রোধে প্রচুর কাজ করছে। গত দুই বছরে সাতশ’ প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির কাছ থেকে প্রায় ৭০ কোটি টাকা জরিমানা আদায় করেছে। আর অধিদপ্তর পরিচালিত ভ্রাম্যমাণ আদালতগুলো আদায় করেছে ৪৬ কোটি টাকা।” তিনি যুক্তি দেখান যে, তাৎক্ষণিকভাবে তাদেরকে জরিমানা করা না হলে বিচারিক পরিবেশ আদালতে গেলে কোনো মামলা থেকেই এই পরিমাণ ক্ষতিপূরণ আদায় সম্ভব হতো না। মনোয়ার ইসলাম দাবি করেন, তার অধিদপ্তরের সবাই ‘সততার পরীক্ষায়’ উত্তীর্ণ। জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও ঢাকা আইনজীবী সমিতির সভাপতি মো. বোরহান উদ্দিন জানান, ২০০৯ সালের মোবাইল কোর্ট আইন অনুযায়ী, জনস্বার্থে পরিবেশ অধিদপ্তরের নিয়ন্ত্রণে নিবার্হী হাকিমরাও পরিবেশ বিষয়ক বিভিন্ন আইন লঙ্ঘনের বিষয়ে শাস্তি দিচ্ছেন। কিন্তু যেহেতু মামলা হিসাবে এ আদালতের নথিগুলি সাময়িক সংরক্ষণ করা হচ্ছে সেজন্য দ্বিতীয়বার অপরাধের বিচারের সময় প্রথমবারের অপরাধ তুলে ধরা যাচ্ছে না । অথচ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন এবং পরিবেশ আদালত আইন লঙ্ঘনে দ্বিতীয় বা তৃতীয় বারের অপরাধে প্রথমবারের চেয়ে বেশি জরিমানার বিধান রয়েছে। পরিবেশ বিষয়ক আইনজীবী মাহবুব হাসান রানা বলেন, ভ্রাম্যমাণ আদালত অন্যান্য ক্ষেত্রে যত সফলই হোক না কেন পরিবেশ আইন ভাঙ্গার বিচারে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারছে না। হাজার পদক্ষেপ নিয়েও তুরাগ নদীর দূষণ বিন্দুমাত্র দূর করতে সমর্থ হয়নি অধিদপ্তর। রাজধানী ও এর আশপাশ ভয়াবহ পরিবেশ বিপর্যয়ের শিকার হলেও ঢাকার পরিবেশ আদালতে পরিবেশ বিষয়ক মামলা বিচারাধীন রয়েছে মাত্র ১০২ টি। চলতি বছর দায়ের হয়েছে মাত্র ১৫ টি মামলা। ২০০০ সালে এ আদালত প্রতিষ্ঠার পর থেকেই পদ্ধতিগত জটিলতা, পরিবেশ সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টিতে কর্তৃপক্ষের অপ্রতুল প্রচারণা, লোকবলের অভাবের কারণেই এ সঙ্কটের সৃষ্টি হয় বলে অনুসন্ধানে জানা গেছে। শুধুমাত্র পরিবেশ বিষয়ক মামলা পরিচালনার জন্য পরিবেশ আদালত স্থাপন করা হলেও এ সংক্রান্ত মামলার অভাবে হত্যা মামলাসহ অন্যান্য সাধারণ দায়রা মামলার বিচার চলছে পরিবেশ আদালতে। ২০০০ সালের পরিবেশ আদালত আইনে মামলার বিচারকাজ চললেও গত বছর এ আইন রহিত করে ২০১০ সালের ৫৬ নম্বর আইন হিসাবে কার্যকর করা হয়। ১৯৯৫ সালের পরিবেশ সংরক্ষণ আইনেরও সংশোধন, পরিমার্জন করা হয় ২০১০ সালে । ২০০০ সালের আইন অনুযায়ী কোনো সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি সরাসরি ক্ষতিপূরণ চেয়ে আদালতে মামলা করতে পারতেন না। ২০১০ সালের আগ পর্যন্ত কোনো ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিকে প্রথমে পরিবেশ অধিদপ্তরে গিয়ে নির্ধারিত ফরমে নালিশ জানাতে হতো। তারা সংক্ষুব্ধ ব্যক্তির আনা অভিযোগ তদন্ত করতো। যদি ৬০ দিনের মধ্যে তদন্ত শেষ করে অধিদপ্তরের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি আদালতে ওই অভিযোগের প্রেক্ষিতে অভিযুক্তের বিরুদ্ধে মামলা না করতেন তবে ক্ষতিগ্রস্ত আদালতে মামলা করতে পারতেন। কিন্তু ২০১০ সালের নতুন আইনে এ বিধান রদ করা হয়। এখন ইচ্ছে করলে যে কেউ আদালতে পরিবেশ দূষণকারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ক্ষতিপূরণ মামলা করতে পারেন। যা বিচারপ্রার্থী জনগণের জন্য অনুকূল পরিস্থিতি সৃষ্টি করলেও মামলা দায়েরের পর আবারো যখন অধিদপ্তরের লোকজনকেই তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়, তখন বিষয়টি আগের মতোই জটিলতার মুখে পড়ে। সংক্ষুব্ধ ক্ষতিগ্রস্তদের একজনের আইনজীবী আমিনুল গনি টিটো জানান, অধিদপ্তরের কতিপয় দুর্নীতিগ্রস্থ কর্মকর্তা-কর্মচারী পরিবেশ দূষণকারীদের কাছ থেকে উৎকোচ নিয়ে তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গায়েব করে দেন, নতুবা গোজামিল প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করেন। ঢাকার পরিবেশ আদালতের রাষ্ট্রপক্ষের বিশেষ কৌশুলি (বিশেষ পাবলিক প্রসিকিউটর) কাজী ফিরোজুর রহমান মন্টু মনে করেন, অধিদপ্তরের মহাপরিচালক স্বয়ং পরিবেশ আইন লঙ্ঘন সংক্রান্ত বিষয়ে আদেশ-নির্দেশ দিচ্ছেন। এ কারণে অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে মামলা আদালতে কম আসছে। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম/পিবি/এইচএ/২৩২১ ঘ. |