আবদুর রহিম হারমাছি প্রধান অর্থনৈতিক প্রতিবেদক
ঢাকা, জুন ৩০ (বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম)- দেশের সবচেয়ে বড় অবকাঠামো প্রকল্প পদ্মা সেতুতে বিশ্ব ব্যাংকের অর্থায়ন বাতিলের ঘটনাটিকে দুঃখজনক বললেও সংস্থাটির সঙ্গে এরপরও আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক দুই উপদেষ্টা আকবর আলি খান ও এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম।
বিশ্ব ব্যাংকের অর্থায়ন বাতিলের সিদ্ধান্তের প্রতিক্রিয়ায় তারা দুজনই বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেছেন, যদি এখনো বিশ্ব ব্যাংকের সঙ্গে আলোচনা করে সমস্যাটার সমাধান করা যায়, তাহলে অন্য যে কোনো ব্যবস্থার চেয়ে ভালো হবে।
দুর্নীতির অভিযোগের ‘বিশ্বাসযোগ্য’ প্রমাণ পাওয়ার কথা বলে বিশ্ব ব্যাংক শুক্রবার পদ্মা সেতু প্রকল্পে তাদের অর্থায়ন বাতিলের ঘোষণা দেয়। ২৯০ কোটি ডলারের এই প্রকল্পে তাদের ১২০ কোটি ডলার দেওয়ার কথা ছিল।
মালয়শিয়ার অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণে সরকারের পরিকল্পনার বিষয়ে আকবর আলি ও মির্জ্জা আজিজ দুজনেরই মত, এতে ব্যয় অনেক বেড়ে যাবে। যার দায় দেশের মানুষ ও সরকারকে বহন করতে হবে।
অন্য যে কোনো ব্যবস্থার চেয়ে বিশ্ব ব্যাংকের মতো অর্থায়নকারী সংস্থাগুলোর অর্থে এই সেতু নির্মাণ করা দেশের জন্য মঙ্গল বলে মনে করেন সাবেক সচিব আকবর আলি।
তিনি বলেন, “মালয়েশিয়া বা অন্য যে কেউ পদ্মা সেতু নির্মাণে অর্থায়ন করলে তারা বাণিজ্যিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিনিয়োগ করবে। তারা বাণিজ্য করার জন্য আসবে। কীভাবে বেশি মুনাফা করা যায়, সেটাই থাকবে তাদের প্রধান লক্ষ্য। বাংলাদেশের মানুষের কথা তারা চিন্তা করবে না। তারা দেখবে তাদের লাভ।”
মির্জ্জা আজিজও বলেন, “এখন যদি সরকার মালয়েশিয়া বা অন্য কোনো বিকল্প অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণ করে, তবে এর ব্যয় অনেক বেড়ে যাবে। তখন আর এই সেতুর মালিকানা সরকারের হাতে থাকবে না, বেসরকারি খাতে চলে যাবে। তখন তারা তাদের মুনাফার জন্য টোল আদায় করবে, যার মাশুল দিতে হবে দেশের মানুষকে।”
৬ কিলোমিটার পদ্মা সেতু নির্মাণ প্রকল্পে বিশ্ব ব্যাংক গত বছর অর্থায়ন স্থগিত করলে মালয়শিয়ার সঙ্গে আলোচনা শুরু করে সরকার। গত ১০ এপ্রিল মালয়শিয়ার সঙ্গে সমঝোতা স্মারক সই হয়। গত ২৮ জুন চূড়ান্ত চুক্তি স্বাক্ষরের লক্ষ্যে খসড়া প্রস্তাব দেয় মালয়শিয়া।
মির্জ্জা আজিজ বলেন, “আমি যতদূর জেনেছি, মালয়েশিয়া যে প্রস্তাব দিয়েছে তাতে তারা পদ্মা সেতু নির্মাণ করলে ৩৯ বছর এই সেতুর মালিকানা তাদের হাতে থাকবে। সে পরিস্থিতিতে ৩৯ বছর এই সেতুর মালিকানা মালয়শিয়ার হাতে চলে যাবে। তখন তারা তাদের মতো করে সেতু পরিচালনা করবে। টোল নির্ধারণসহ সবকিছুই থাকবে তাদের হাতে।”
বিশ্ব ব্যাংক চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ায় মালয়শিয়ার সঙ্গেই এগোনো হবে কি না- জানতে চাইলে ওবায়দুল কাদের বলেন, তাদের প্রস্তাব যাচাই-বাছাই করা হবে।
মালয়শিয়ার অর্থে পদ্মা সেতু নির্মাণে প্রধান বিরোধী দল বিএনপিও আপত্তি জানিয়ে আসছে। তবে যোগাযোগমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, মালয়শিয়ার প্রস্তাব গ্রহণের ক্ষেত্রে জাতীয় স্বার্থ, অর্থনৈতিক স্বার্থ এবং জনগণের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
পদ্মা সেতু নির্মাণে বিশ্ব ব্যাংকের পাশাপাশি এডিবি ৬১ কোটি, জাইকা ৪০ কোটি এবং আইডিবি ১৪ কোটি ডলার ঋণ দেওয়ার জন্য সরকারের সঙ্গে চুক্তি করে ।
মূল অর্থায়নকারী সংস্থা বিশ্ব ব্যাংক চুক্তি বাতিল করলেও তাদের সঙ্গে আলোচনার পরামর্শ দিয়ে আকবর আলি বলেন, “আমি মনে করি এখনো সময় আছে। বিষয়টি পুনঃবিবেচনা করে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা যেতে পারে।”
সরকারকে সে পথে এগোনো পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, “সরকারকে যদি কোনো ছাড় দিতে হয়, সে বিষয়টিও বিবেচনা করা যেতে পারে।”
“একটা বিষয় মনে রাখতে হবে। দাতাদের ছাড়া পদ্মা সেতু নির্মাণ হলে তা দেশের জন্য কখনই ভালো হবে না। এ বিষয়টি বিবেচনায় রেখেই সরকারকে বিশ্ব ব্যাংকের সঙ্গে অলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পথ বেছে নিতে হবে এবং তা দ্রুত নিতে হবে।”
মির্জ্জা আজিজ বলেন, “পদ্মা সেতুর মতো বড় প্রকল্প দাতাদের অর্থায়নেই হওয়া উচিৎ বলে আমি মনে করি। কেননা, এতো কম সুদে আর কারো কাছ থেকে ঋণ পাওয়া যায় না।”
“যদি বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে আলোচনা করে সমস্যাটার যে কোনোভাবে সমাধান করা যায়, তাহলে অন্য যে কোনো ব্যবস্থার চেয়ে এই পথ ভালো হবে। সরকারের সে পথই বেছে নেওয়া উচিৎ,” বলেন তিনি।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম/এআরএইচ/এমআই/১৩৩৩ ঘ.